শিরোনাম :

10/trending/recent

Hot Widget

অনুসন্ধান ফলাফল পেতে এখানে টাইপ করুন !

শিক্ষা ও শিক্ষকের মর্যদা

আদিমকালে মানুষ অনাদর্শিক বর্বরতার জীবনে অভ্যস্ত হলেও এরা স্বজাতি/গোষ্টীর প্রতি ছিল আনুগত্য এবং সহানুভূতিশীল। এটি আসলে শিষ্টাচারের বৈশিষ্ট্য, যেটি তারা মানলেও বুঝতো না। কারন এরা ছিল অবুঝ, অজ্ঞ, অসভ্য, কিন্তুু আজ মানুষ সভ্যতার স্বর্ণশিখরে আরোহন করলেও শিষ্টাচার ভূলে মুহুর্তেই আপনাকে ভুলে যায়। 

অর্থ আর সম্মানকে একসাথে গুটিয়ে অনর্থের জন্ম দেয়-আর সেটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাঝে দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়।কথাগুলো এজন্য বলছি যে,দুদিন আগের আমার একটি লিখা আমাকে অনর্থের বিতর্কে জড়িয়ে ফেলে কিন্তু মোটেও বিব্রত হইনি। কারন অজ্ঞতা সর্বদাই অনর্থ ও অনৈক্যের সৃষ্টি করে।

১৮৫০ এর দশকে বাঙ্গালীদের মধ্যে যারা সবচেয়ে বেশি বেতন পেতেন, ইশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর তাদের অন্যতম।তা সত্বেও অসম বৈষম্য  ও মতপার্থক্যের কারনে চাকুরী চেড়ে দিলে ভবঘুরে একদল মানুষ বলতে শুরু করেছিল,বিদ্যাসাগর এখন খাবেন কি? উত্তরে তিনি বলেছিলেন,আলু আর পটোল বিক্রি করে--তাও ভালো। 

এতবছর পেরিয়ে এখনো কি তাই বলা যাবে? না,বলা যাবে না -এখনকার বিদ্যার সাগররা শিক্ষকতার সাথে ভিন্নমাত্রা যুক্ত করে পরিচিত হতে স্বাচ্ছন্দবোধ করেন অন্য নামে--সেকালের আলু আর পটোলের বদলে বিক্রি করেন সংবাদ-সেঝেঁ যাবেন বুদ্ধিজীবি।  শিক্ষক,সাংবাদিক,ডাক্তাররা নাকি পড়েন এই কাতারে।যুগে যুগে তাদের নির্ভীক লেখনি সমাজকে সচেতন করে অধিকার আদায়ে মানুষকে করেছে জাগ্রত।কিন্তু আজ একজন শিক্ষক কখনো ঠিকাদার,কখনো ব্যবসায়ী,কখনো  সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেন।


যে যার মতো করে বিদ্যা সাগরের মহৎ পেশাকে আড়ালে রেখে বিভিন্ন রঙ্গে সেঝে যান।সেখানেই অবক্ষয়ের সৃষ্টি, যেটি আমাদের উপলব্ধি আর অনুভূতিতে জাগ্রত নেই। শিক্ষায় শিক্ষকতার পেশায় সর্বদা যুক্ত মানুষটি কতটা অসহায় হলে পরে সে প্রতিনিধিত্ব করেন অন্য প্রতিষ্টানের হয়ে, প্রশিক্ষন গ্রহন করে অন্য পরিচয়ে! এটিতে আমাদের লজ্জা হওয়া উচি! কেউ কেউ শিক্ষকের মার্যদায় আঘাত দিতেও কুন্ঠা বোধ করেন না। 

এইতো সেদিন একজন শিক্ষক সাংবাদিকতার কলমের কালির আঁচড়ে শিক্ষক ও শিক্ষা প্রতিষ্টানকে কলংকিত করার চেষ্টা করেছেন। সত্য/মিথ্যার আড়ালে যাই কিছু থাকুক,এটি কি তার পেশা দারিত্বের অংশ? একবারও কি ভেবে দেখেছেন একজন পেশাদার শিক্ষক হিসাবে আপনি আপনার মুল পেশাকে আড়াল করে সরকারি অনুষ্ঠানে (লাভজনক যেমন-প্রশিক্ষণ,কর্মশালা,সাংবাদিকতার বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সহ করোনা কালীন প্রনোদনা )কোন পরিচয়ে যোগদান করেছিলেন? মুলপেশাকে গোপন করে অন্য পরিচয়ে যে কোন কর্মযজ্ঞে অংশগ্রহণ করে দুটি খাত থেকে বেতন/ভাতা গ্রহন করা কতটা অনৈতিক- সেটি বোধহয় আমাদের সকলের জানা।

তবে এটির জন্য বিচারের প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধুই  মানবিক মুল্যবোধের। কিন্তু এটি যেখানে অনুপস্থিত সেখানে আমরা কতটা মানুষ ? অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ যতটা সহজ তাচেয়ে ভদ্রভাষায় কথা বলা ততটাই কঠিন।এইতো সেদিন পুর্বধলা উপজেলার  বিলজোড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক ছাত্রকে শাসন করার অপরাধে মামলার আসামী হয়ে আদালত থেকে জামিনে এসেছেন।

ভেবে দেখুনতো পেশাগত জীবনে আমরা এই সহকর্মীর ব্যাথা বা ইজ্জতকে কতটুকু শেয়ার করতে পেরেছি ?তাহলে এগুলো কিসের আলামত? এবিষয়ে শিক্ষা বিষয়ক একজন উর্ধ্বতন কর্তা ব্যক্তিকে বলতে শুনেছি যেদিন থেকে বলা শুরু হয়েছে আমার সন্তানকে শাসন করার আপনি কে? সেদিন থেকেই নৈতিক অবক্ষয় আর ছাত্রের বেয়াদবির মাত্রা বাড়তে শুরু হয়েছে।


নীতি নির্ধারকগন মনে করেন, একটি দেশের জন্য শিক্ষায় বিনিয়োগ হচ্ছে একটি লাভজনক বিনিয়োগ। শিক্ষায় বিনিয়োগ হলে শিক্ষিত ও চৌকস জনগোষ্ঠী তৈরি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষকদের অবস্থা তার উলটো। এ দেশের শিক্ষকরা সমাজে সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত ও বঞ্চিত। দেশে বহুল আকাঙ্ক্ষিত চাকরির অন্যতম হলো বিসিএস।

এই বিসিএসের ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে শিক্ষা ক্যাডার প্রথম পছন্দ দিয়েছেন এমন প্রার্থী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তাহলে শিক্ষকতা পেশার কেন এই অবস্থা?বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের মর্যাদা রাষ্ট্রীয় পদক্রমে যুগ্ম সচিবের পদমর্যাদায় সিল করে দেওয়া হয়েছে। এর ওপরে ওঠার সুযোগ নেই। 


শিক্ষকের মর্যাদা যেটুকু অবশিষ্ট আছে, তা কেবল মুখে আর বই পুস্তকে। কবি কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কবিতাটি আজকাল শিক্ষকের সম্মানের বিষয়ে শুধুই  রূপকথামাত্র। আগে বলা হতো শিক্ষক সেবিলে উন্নতি হয়, আর এখন শিক্ষক ছেঁচিলে উন্নতি হয়। হরহামেশাই শিক্ষকরা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হন-বঞ্চিত হন সুষম বন্টনে, ধিকৃত হন শিক্ষক সাংবাদিকের অমোচনীয় কালিতে,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কমেন্টসে।আবার নিরীহ এই পেশার মানুষগুলোকেই বাদশাহ আলমগীরের ছেলে পা ধুয়ে দিয়েছিলেন--আর এখন পুরো গা ধুয়ে দিচ্ছে। পাঁজাকোলো করে পুকুরে ফেলে দিচ্ছে।


তাই হয়তো ঐতিহাসিক চাণক্যের শ্লোকে লিপিবদ্ধ রয়েছে, ‘শিক্ষককে কখনো অবহেলা করা উচিত নয়। সৃষ্টি ও ধ্বংস দুয়েরই বীজ লুকিয়ে রয়েছে শিক্ষকের মধ্যে।’ জাতিকে ভাবতে হবে যে, জাতির মেরুদণ্ডের চালিকা শক্তিকে বঞ্চিত করে ও সমাজে হেয় প্রতিপন্ন করে, সমাজ-রাষ্ট্রে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা যাবে না।

বিদেশি একটি পত্রিকা ডেইলি মেইলের খবর অনুযায়ী দক্ষিণ পশ্চিম লন্ডনের ব্যান্ডন হিল প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইসাবেল রামসের বার্ষিক বেতন ১লাখ ৯০ হাজার ৮৯৮ পাউন্ড আর প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বেতন ১লাখ ৪২হাজার ৫০০ পাউন্ড।এখন হয়তো কেউ বলে বসবেন এদেশের শিক্ষকের সেই যোগ্যতাই নেই, আরে ভাই তবুওতো শিক্ষক। 

মুসলিম মনীষী ইবনে খলদুনের মতো ব্যক্তি তার "আল মুকাদ্দিমা" গ্রন্হে লিখেছেন,"শিক্ষকও একজন মানুষ। সমাজের আর দশজন মানুষের মতো শিক্ষকেরও বেঁচে থাকার উপকরণের প্রয়োজন আছে"। তাই শিক্ষকের পেশাদারীত্বের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রাপ্য মার্যদা অক্ষুন্ন রেখে রাষ্ট্রকেই শিক্ষা ও শিক্ষকদের প্রতি আরো মনোযোগী হতে হবে।অন্যথায় শিক্ষা ঘাটতি কখনোই পুরন হবে না।

লেখক : মোঃ এমদাদুল হক বাবুল  প্রভাষক, ইতিহাস বিভাগ,পূর্বধলা সরকারি কলেজ। 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad