গাড়ি চলছে পদ্মা সেতুতে, রেল চলতে অপেক্ষা ছয় মাস - Purbakantho

শিরোনামঃ

রবিবার, ২৬ জুন, ২০২২

গাড়ি চলছে পদ্মা সেতুতে, রেল চলতে অপেক্ষা ছয় মাস

ঢাকা: জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে দ্বার খুলল পদ্মাসেতুর। ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর ২৬ জুন থেকে পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয়েছে। কিন্তু ট্রেন চলাচলে সময় লাগবে আরও অন্তত ছয় মাস। 

এমন তথ্যই জানিয়েছেন পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, পদ্মাসেতুর সড়কের অংশ উদ্বোধনের পর রেল লাইন বসানোর জন্য অনুমতি পাবেন তারা। আর সে কাজ শেষ করতে চলতি বছরের ডিসেম্বর পার হয়ে যেতে পারে। সমান গতিতে কাজ চলতে থাকলে আগামী বছরের শুরুতেই পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে রেল চলবে বলে আশা প্রকাশ করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।,

সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প ‘পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প’। নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে প্রকল্প শেষ করে গত ২৫ জুন যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার সঙ্গে সরাসরি সড়ক পথে যোগাযোগ টেকসই হলো।,

পরিকল্পনা অনুযায়ী ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের দ্বিতল বিশিষ্ট দেশের সবচেয়ে বড় ও প্রতীক্ষিত পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে চলবে সড়ক যানবাহন আর নিচ দিয়ে চলবে ট্রেন। ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেল লাইন স্থাপনের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তদেশীয় রেল যোগাযোগের পরিকল্পনা রয়েছে। এ রেলপথ দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২৩ জেলায় প্রথম রেলসংযোগ স্থাপন করবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে- পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের সঙ্গে ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জ ও পদ্মাসেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত মোট ১৭২ কিলোমিটার ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণ হবে। ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি তিনভাগে ভাগ করে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এরমধ্যে ঢাকা থেকে মাওয়া, মাওয়া থেকে ভাঙা এবং ভাঙা থেকে যশোর পর্যন্ত মোট ১৭২ কিলোমিটার রেলপথ ২০২৪ সালের মধ্যে শেষ করার কথা রয়েছে।,

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল- চলতি বছরের জুনের মধ্যে পদ্মাসেতুর সড়ক পথের সঙ্গে সঙ্গে রেলপথে মাওয়া থেকে ফরিদপুরের ভাঙা পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার অংশ আগে চালু করা হবে। কিন্তু পদ্মাসেতুর ওপর রেলপথ তৈরির নির্দিষ্ট অংশে গ্যাস লাইন স্থাপনের কাজ চলমান থাকায় সড়কের সঙ্গে রেললাইনের কাজ শেষ করা যায়নি।,

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জুলাইয়ের মধ্যেই সেতু বিভাগ কাজের অনুমতি দেবে। এরপরই শুরু করে লাইন বসানোর কাজ। যে কারনে পদ্মাসেতু দিয়ে গাড়ি চলাচল শুরু হলেও রেল চলাচলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে আরও ছয় মাস।,

এ প্রসঙ্গে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক মো. আফজাল হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মাসেতুর নিচতলা দিয়ে গ্যাস লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। যার কাজ এখনও শেষ হয়নি। অন্যদিকে সেতু বিভাগ কাজ শুরুর অনুমতি দেয়নি। যে কারণে আমরা লাইন বসানোর কাজ শুরু করতে পারিনি।’

তিনি বলেন, ‘আগামী মাসে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষকে সেতুর নিচতলা বুঝিয়ে দেবে বলে জানিয়েছে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে হয়তো বুঝে পাবো। এরপর আমরা দেখব সেতুর সড়ক অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচলের কারণে কম্পনের সৃষ্টি হয় কীনা, আর কম্পন হলে তাতে রেল লাইন বসাতে অসুবিধা হয় কীনা। যদি অসুবিধা হয় তাহলে সেতু বিভাগকে যানবাহনের গতি কমিয়ে চলাচল করতে ব্যবস্থা নিতে সেতু বিভাগকে চিঠি পাঠানো হবে।’

তিনি বলেন, ‘এ সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে ছয় মাস সময় লাগবে। এরপর নতুন বছরের জানুয়ারিতে পদ্মাসেতুর ওপর দিয়ে রেল চলাচলের উদ্বোধন করা যাবে আশা করি।’

কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’

মোট প্রকল্পটি তিন ভাগে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রথম পর্যায়ে ভাঙা থেকে মাওয়া পর্যন্ত অংশ শেষ করা হবে। এই অংশ চালুর মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুতে রেল চলাচল শুরু করবে। এরপর ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত দ্বিতীয় ভাগে বাস্তবায়ন করা হবে। এ অংশের অগ্রগতি ৪০ শতাংশ। বড় ধরনের কোনো বিপদ না হলে আগামী বছরের ডিসেম্বর নাগাদ ঢাকা থেকে ভাঙা পর্যন্ত রেল চলাচল করতে পারবে। এরপর ভাঙা থেকে যশোর পর্যন্ত অংশের কাজ শেষ হবে ২০২৪ সালে।’

এই পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার কোটি মানুষকে সরাসরি সড়কপথে যুক্ত করবে।,

১৯৯৮ সালে যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতুর উদ্বোধনের পরপরই দাবি ওঠে পদ্মার বুকে সেতু নির্মাণের। তবে প্রমত্তা পদ্মাকে বাগে এনে এর বুকে ইস্পাত-কংক্রিটের কাঠামো নির্মাণ সহজ ছিল না। সেই প্রকৌশল দিক বাদ দিলেও পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়েও তৈরি হয় প্রতিবন্ধকতা।

১৯৯৮-৯৯ সালে পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর ২০০১ সালের ১২ জুলাই প্রথম পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্ব চার দলীয় জোট ক্ষমতায় এলে খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি সেতু প্রকল্পের। ওয়ান-ইলেভেনখ্যাত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অবশ্য সেতুটির প্রথম প্রকল্প একনেকে পাস করা হয়। ২০০৯ সালে সেতুর নকশা প্রণয়নের প্রস্তাবে অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর প্রস্তাব। প্রথম দফায় সংসদে সেতুর ব্যয় সংশোধন করে নির্ধারণ করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা।

২০১১ সালের ২৮ এপ্রিল পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ১২০ কোটি ডলারের ঋণচুক্তি সই হয়। তবে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণচুক্তি স্থগিত করে বিশ্বব্যাংক। পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০১২ সালের ২৩ জুলাই তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন পদত্যাগ করেন। শর্তসাপেক্ষে এ প্রকল্পে আবার ফেরতও আসে বিশ্বব্যাংক। তবে ২০১৩ সালের ৪ মে বিশ্বব্যাংকের ঋণসহায়তা প্রত্যাখ্যান করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ঘোষণা দেন শেখ হাসিনা।

২০০১ সালের ১২ জুলাই প্রথম পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হয়। এরপর দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় পদ্মা সেতুর বাস্তবায়নের মূল পাইলিং কাজের উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা।,

২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পদ্মা সেতুর প্রথম স্প্যান বসানো হয়। ২০১৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর স্প্যানে রেলওয়ে স্ল্যাব বসানো শুরু হয়। সড়কপথের জন্য স্ল্যাব বসানোর কাজ শুরু হয় ২০১৯ সালের ১৯ মার্চ।

২০২০ সালের ১০ ডিসেম্বর সবশেষ ৪১তম স্প্যানটি বসানোর মধ্য দিয়ে ৪২টি পিলারের ওপর ৪১টি স্প্যানে পূর্ণ ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৃশ্যমান হয় পদ্মা সেতু। ২০২১ সালের ২৩ আগস্ট পদ্মা সেতুতে সবশেষ সড়ক স্ল্যাব স্থাপনের পর মূল সেতুতে পিচ ঢালাইয়ের কাজ শুরু হয় ১০ নভেম্বর।,

২০২২ সালের ১৭ মে পদ্মা সেতুতে যানচলাচলের জন্য টোলের হার নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ‘পদ্মা সেতু’ নামকরণ করে সেতু বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় ২৯ মে।,

শেখ হাসিনার হাত ধরে সর্ম্পণূ নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মতো এক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের যে সাহস দেখিয়েছিল বাংলাদেশ, সেই শেখ হাসিনার হাতে উদ্বোধনের মাধ্যমেই আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ পরিচয়কে বিশ্বের বুকে তুলে ধরার এক চক্র পূরণ হয় ২৫ জুন।,

from Sarabangla https://ift.tt/9CIaWq2

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন