সন্ধ্যা তারা......... - Purbakantho

শিরোনামঃ

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

সন্ধ্যা তারা.........

কালো মেয়ে কাকলী, গাঁয়ে জন্ম তার। পড়াশুনা প্রাথমিক পর্যায়ের গ্রামের বিদ্যালয়ে, কলেজের পড়াশুশা জেলা শহরের একটি মহিলা কলেজে। কাকলীর গায়ের রঙ কালো হলেও ওর মিষ্টি নাম,মায়াবী চেহারার জন্য সবার কাছে সে মিষ্টি নামে পরিচিত। মায়া হরিনীর মত টানা টানা চোখ সবার নজর কাড়লেও তার শরীরের কালো রঙ তার কাল! নেচে গেয়ে গ্রাম মাতিয়ে শিশু, কিশোরী জীবনের দীর্ঘ সময় পার করে। ,

তারপর টিন এজ ও তেইস বছরের জীবনে পা রাখার প্রাক্কালে নিজের শরীরের কালো রঙ, প্রেম ভালবাসার বাজারে উঠাতে না পেরে বঞ্চিত হলেও সে নিজেকে আড়াল করে রাখেনি। পীর ফকিরের মাজার, কবিরাজের তাবিজ কবজের ধোকাবজি খেয়েও জীবন যুদ্ধের ছাড়েনি কাকলী। যৌতুকের বাজারে সমর্পিত হতে সকল চেষ্টা করেছে সে। তার আক্ষেপ সমাজটা নোংড়া ও কলুশিত।


অর্থলোভী নর পিচাসরা নারীকে জীবন সঙ্গিনী হিসেবে নয় চায় ক্ষনিকের জন্য। কিছু কিছু মানুষ চকচকে বাহিরের সুন্দর্যকে পছন্দ করে। কেউ বা অর্থলোভী, কেউ সাময়িক ভালবাসার প্রেম পিয়াসী। আর অন্যরা সবাই নারীর শরীরের সুন্দর রঙের পিছনে ছুটে, পিছনে থাকায় না। সস্তা সৌন্দর্যে মানুয়ের জীবন ফুটে উঠলেও বাস্তবতাটা কঠিন? ভিন্ন স্বাধে রূপ বদলায় কিছু মানুষ নামের অমানুষরা। তাই বলে সব মানুষ যে এক মাপের তাও নয়। ,

ভাদ্র মাসের বৃষ্টি ভেজা বিকালে মামাতো বোনের বিয়ের অনুষ্ঠান । ভীরের মাঝে ধাক্কা লেগে বর যাত্রী রিহান নামের এক যুবক ছেলের সাথে পরিচয় হয় কাকলীর। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার পর বর পক্ষ কনে নিয়ে চলে গেল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা’ বিয়ে বাড়ী ফাঁকা। স্বজনরা অনেকে ফিরে গেল যার যার বাড়ীতে। বিয়ের অনুষ্ঠানে কাকলী তার সহচরদের নিয়ে খুব মজা করে ।


তার নিজের মনের কষ্ট ভূলে ধূমধাম হৈ-চৈ করে অনেকটা সময় পার করেছে নিজেকে লুকিয়ে রেখে। কাকলী মাঝে নতুন ভাবনা দোলা দেয়। রিহানকে ভাল লেগেছে কাকলীর। ছেলেটা খুবই ভদ্র। তার মনের মধ্যে একটা এ নিয়ে তোলপাড় চলছে। এরপর এক সময় মুঠো ফোনে দু’জনার আরও কাছাকাছি আসা শেষে ভালবাসাবাসি। ,

দু’জনের মাঝে সম্পর্কটা এক সময় গভীর হয়। তখন কাকলী একটি বেসরকারী সংস্থায় ভাল চাকুরিতে যোগদান করে। চাকুরীর প্রয়োজনে তাকে এলাকা ছাড়তে হয়। তবে মাঝে মধ্যে দু’জনার দেখা হত। কিছুদিনের ব্যবধানে প্রেমিক রিহানও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে গেলে রিহানের সাথে কাকলীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। স্বপ্নের মাঝ থেকে হারিয়ে যায় রিহান। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর কাকলী নিজের ভাবনায় সন্দেহের ভেরাজালে আক্রান্ত হয়ে মানসিক যন্ত্রনায় কাতর হয়ে পড়ে।,

কাকলীর চাকুরীর কর্ম এলাকায় একটি বাসার মেসে ৪ সহকর্মীদের নিয়ে অবস্থান করে। রিহানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার দীর্ঘ সময় পর কাকলী মন ভেঙে পড়ে। বিষন্ন জীবন, কাজে অনিহায় কর্তাদের বকুনি, জীবন বিষিয়ে উঠে। তার জীবনের কঠিন সিদ্বান্ত বাস্তবায়ন করার দিনটি ছিল শুক্রবার, অফিস ছুটির দিন । রুমমেট ৩ জনের দু’জন বাড়ী চলে গেছে।


শুধু নিলা নামের একজন যায়নি। কাকলী নিজের সিদ্ধান্তে দিনে শহর থেকে বিষ কিনে এনে শুবার ঘরে লুকিয়ে রাখে । রাত দুপুরে সবাই যখন ঘোর ঘুমে থাকবে তখন সে বিষ পান করে মনের জ্বালা মিটাবে। দিনের আলো নিভে গেছে পৃথিবী থেকে। সন্ধাতারা আকাশে ঝিলমিল করছে। সহপাঠী নিলাকে তার পরিকল্পনা বুঝতে না দিয়ে তার সাথে রাতের প্রথম প্রহরে খাবার খায় দু’জনে একসাথে। নিলা ঘুমিয়ে পড়ে। কাকলী একাকী জেগে আছে। ,


জীবনের শেষ লগ্নে মনে লাখো স্মৃতি ডাল পালা ছড়াচ্ছে। মনে পড়ছে শিশুকাল, কৈশোর কাল, হায়রে মনে রাখার মত কত স্মৃতি। অমলিন সেই স্মৃতি তার চোখের সামনে একে একে জড়ো হচ্ছে। ধূলি ঝড়ের চোখে খুঁচা দিয়ে কচু পাতায় বৃষ্টির পানির মত ছলাত ছতাৎ করে ঝরে পড়ছে। জীবনের আর বেশী সময় নেই কাকলীর কাছে, তাই শেষ লেখা--। ,


প্রিয়, আমার চলে যাওয়ার কথা গোপন থাকবে না। কেউ না কেউ খবরটা তোমার কানে পৌছাঁবে, আমি চলে গেছি তোমার সীমানা পেরিয়ে অনেক দূরে, সেখান থেকে কেউ কোনদিন ফিরে না। আমিও ফিরব না, কোনা দিন। আমি চাই না তুমি তাৎক্ষনিক জেনে যাও, আমার চলে যাবার কথা। আমি চাই না ক্ষনিকের জন্য তোমার মন কাদুঁক আমার জন্য ।


জেনে রেখ, তুমি যত দূরে তার চেয়ে অনেক বেশী দূরে আমার মঞ্জিল। রিহান তুমি সুখে থেক, তুমি চাইলে অপেক্ষায় মালা হাতে দাড়িঁয়ে থাকতাম যুগ যুগ। তুমি আমার জীবনে যখন ছিলে না, তখন আমি ভাল ছিলাম। ভাবছি এত সুন্দর পৃথিবী! রঙ্গিন জীবন, আশা গুলো কত যে স্বপ্ন দেখায়? এতশত ভাবনার মাঝে এই মহুর্তে আমার জীবন চিরতরে অস্তমিত হবে। তবু কেন এত ব্যকুলতা কেন মন দিশেহারা। ,


যন্ত্রনার জীবন! তন্দ্রায় চোখ বন্ধ হয়ে আসছে কাকলীর। ভাবনার শেষ নেই। কত কল্পনা যে তাকে আকঁড়ে ধরছে ? অঝরে ঝরছে চোখের জল। এমন সময় মোবাইলের অপরিচিত নম্বর থেকে কল এল। মোবাইলের রিং থেমে থেমে বেজেছে কয়েকবার ।জীবনের যবনিকায় কে? রিসিপ করার পর কাকলীর কানে আওয়াজ এল আমি, আমি তোমার রিহান। তুমি কাদঁছ? ঘুমাওনি বুঝি এখনও। কাকলীর কান্নার গতি আর যেন থামাতে পারছে না। তবু নিজেকে সংযত করে রিহানকে প্রশ্ন করে কেন, ফোন করেছ? ,


আমি আজ এইতো এখন হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছি। আর একটু সুস্থ হয়েই দেশে ফিরে আসছি। সৃষ্টিকর্তা মৃত্যু থেকে তোমার কাছে ফিরে আসার সুযোগ করে দিয়েছেন। সংযোগ কেটে গেল। মৃত্যুর আলিঙ্গন থেকে আবার মনে ভালবাসার স্বাধ! কাকলীর, বিষের শিশি জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে জাংলায়। লেখা চিঠি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে মেঝেতে ফেলে ঘরের আলো নিভিয়ে বিছানায় পড়ে ডুকরে কাঁদতে থাকে কাকলী। নিলার ঘুম ভেঙে যায়। ‘কাকলী নিলাকে জড়িয়ে ধরে বলে আমি বাঁচতে চাই, নিলা আমি বাঁচতে চাই। ,


লেখকঃ সাংবাদিক/গল্পকার
এস এম সারোয়ার খোকন
মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন