অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি বলাকা - Purbakantho

শিরোনামঃ

রবিবার, ২৮ আগস্ট, ২০২২

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি বলাকা

নিউমার্কেটের ‘বলাকা সিনে ওয়ার্ল্ড’ তথা বলাকা সিনেমা হল—বাংলা সিনেমার দর্শকদের কাছে এক আবেগের নাম। সত্তর-আশি, নব্বই এমনকি গত দুই দশকেও নতুন বাংলা ছবির মুক্তি মানেই যেন বলাকার সামনে দর্শকের ভীড়। ভালো ও মানসম্পন্ন সিনেমার প্রযোজক-পরিচালক কিংবা দর্শকদের পছন্দের তালিকায় উপরের দিকেই ছিলো হলটির নাম।
মাঝে করোনা ও নানাবিধ কারণে যখন বাংলা সিনেমায়ও লেগেছিল গ্রহণ- ঠিক সেই সময়ে বন্ধ করে দেওয়া হয় বলাকা। এদিকে চলতি দুই ইদেই দেশের সিনেমায় যখন লেগেছে পরিবর্তনের ‘হাওয়া’, সিনেমাপ্রেমীদের ‘পরান’-এ যখন আবার বাংলা সিনেমা; তখন ঐতিহ্যবাহী এ সিনেমা হলটির বন্ধ থাকা পীড়া দিচ্ছে দর্শকদের মনে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্কারের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে হলটি। কিন্তু অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা। দশ মাসের অনুসন্ধানে কথা হয় হলটির সাবেক কর্মকর্তা, কর্মচারীদের সঙ্গে। 


তারা জানিয়েছেন, ২০২০ এর ২০ মার্চ করোনার কারণ দেখিয়ে হলটি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই গেইটে তালা। জ্বলেনি প্রায় ৬০ বছরের পুরোনো প্রজেকশন রুমের আলো। আলো নেই বহু বছর ধরে কাজ করে আসা ঐতিহ্যবাহী হলটির কর্মকর্তা কর্মচারীদের মনেও। কেননা, কবে আবার হলটি চালু হবে বা আদৌ হবে কি না সেই আশাই যে দিতে পারছেন না কেউ। স্বাভাবিকভাবেই ২০২০ এর মার্চের পর কর্মচারীদের কেউই বেতন পাননি। 


নিরূপায় অনেকেই বেছে নিয়েছেন বিকল্প পেশা। কিন্তু করোনার পর সিনেমার সুদিনের প্রত্যাশায় যখন সবাই উন্মুখ, তখন কেন বন্ধ দেশের সিনেমার ইতিহাস নির্মানের অন্যতম কারিগর এ সিনেমা হলটি? এ বিষয়ে হলটির একজন কাউন্টারম্যান জানান, মালিকপক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বলি হয়েছে বলাকা। কী সেই দ্বন্দ্ব?- এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নেমে জানা গেছে পরস্পরমিশ্রিত কিছু তথ্য। জানা যায়, সিনেমা হলটির সবশেষ মালিক মোহাম্মদ হাসান ইমাম মারা যাওয়ার পর তার উত্তরাধিকারদের মধ্যে মালিকানার অংশ নির্ধারণ নিয়ে মামলা চলছে। 


যার নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে হলটি চালু করা যাচ্ছে না। অথচ আদালতের দিক থেকে হলটি বন্ধের বিষয়ে কোনো নির্দেশনা নেই। ১৯৬৪ সালে রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকায় চালু হয় বলাকা সিনেওয়ার্ল্ড। প্রথম দিকে বলাকা ও বিনাকা নামে দুটি আলাদা হল ছিল। পরবর্তীতে বিনাকা বন্ধ করে ‘বলাকা’ ও ‘বলাকা ২’ করা হয়। বছরচারেক আগে ‘বলাকা ২’ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বন্ধ হওয়া 'বলাকা' হলটিতে ১ হাজারের উপর আসন ছিল। নিউমার্কেট, ঢাবি, বুয়েট, ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজসহ স্কুল, কলেজ ও মার্কেটবেষ্টিত এলাকায় হওয়ায় হলটি সব সময় লাভে পরিচালিত হতো। বলাকার প্রথম মালিক এম এ হাসান ‘হাসান মুভিজ লিমেটেড’-এর অধীনে হলটি চালু করেছিলেন। তার ছিল পাঁচ ছেলে ও এক মেয়ে। সত্তরের দশকে মৃত্যুর পর তার ছেলে-মেয়েরা পর্যায়ক্রমে হলটি পরিচালনা করেন। সবশেষ এম এ হাসানের ছেলে মো. হাসান ইমাম কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন। তিনিও ২০১৯ সালের ৭ নভেম্বর মারা যান। 


এরপর তার দুই স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এ সময় ‘হাসান মুভিজ লিমেটেড’-এর আমমোক্তার নিযুক্ত করা হয় ঢাকার আরেক ঐতিহ্যবাহী সিনেমা হল সনি সিনেমা হলের মালিক মোহাম্মদ হোসেনকে। ওই সময়ে কোম্পানির চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা হাসান আলী ইমাম রেজিস্টার্ড আমমোক্তার হিসেবে মোহাম্মদ হোসেনকে নিযুক্ত করেন। এরপর থেকে ‘হাসান মুভিজ লিমিটেড’ এর পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। এখানে উল্লেখ্য, সে সময়কার কোম্পানির চেয়ারম্যান এবং বর্তমান এমডি হাসান আলী ইমাম সম্পর্কে মোহাম্মদ হোসেনের মেয়ের জামাতা। হল বন্ধের কারণ অনুসন্ধানে মোহাম্মদ হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করে সারাবাংলা। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘করোনাকালে ছয় মাসে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা লোকসান হয়েছে। যার কারণে আমরা তখন হলটি বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলাম। এখন চালু করতে পারছি না কারণ, হাসান মুভিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মারা গেছেন। তার প্রথম স্ত্রীর বড় ছেলে এমডি ও মেয়ে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন। 


কিন্তু দ্বিতীয় স্ত্রী ও তার ছেলেমেয়ের সঙ্গে উত্তরাধিকার ও বন্টন বিষয়টি নিষ্পত্তি না হওয়ায় হলটি চালু করা যাচ্ছে না।’ মোহাম্মদ হোসেন আরও জানান, মো. হাসান ইমাম মারা যাওয়ার পর কোম্পানী আইন অনুযায়ী তার দুই স্ত্রী, দুই ছেলে ও দুই মেয়ে কোম্পানীতে তার অংশের শেয়ার হোল্ডার হওয়ার কথা। কিন্তু এ ছয়জনের উত্তরাধিকার নিশ্চিত করার জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয় ও আদালত থেকে ওয়ারিশ সনদ জমা দিতে হবে জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে। ওয়ারিশ নিষ্পত্তির জন্য ওয়ার্ড কাউন্সিলের সনদ পেয়ে গেছেন তারা। কিন্তু আদালত থেকে এখনও পাননি।


আবার ঢাকা যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে উত্তরাধিকার নির্ধারণ মামলা চলছে। যে মামলাটি করেছেন মো. হাসান ইমামের প্রথম স্ত্রী জাহানারা ইমাম। এদিকে অনুসন্ধানে সারাবাংলা জানতে পেরেছে দ্বিতীয় স্ত্রী নাসিমা ইমামের বিরুদ্ধে একটি মামলা হয়েছে। এই মামলার ব্যাপারে মোহাম্মদ হোসেন জানিয়েছেন, নাসিমা ইমামের বিরুদ্ধে মামলাটি করা হয়েছে কোম্পানীর তরফ থেকে। তিনি দায়িত্ব থাকা অবস্থায় কোম্পানীর আর্থিক লেনদেনে কিছু সমস্যা হয়েছে। সমস্যা নিষ্পত্তির জন্য তার বিরুদ্ধে কোম্পানির তরফে মামলা করা হয়েছে। ‘এত মামলা থাকলে কীভাবে আবার হলটি চালু হবে?’ সারাবাংলার এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ হোসেন জানান, ‘উত্তরাধিকার সনদ সামনের মাসেই পেয়ে যাব আশা করছি।, 


কারণ ২৯ সেপ্টেম্বর আদালত এ ব্যাপারে রায় দেওয়ার কথা রয়েছে। আমরা আশা করছি উত্তরাধিকার সনদ পেয়ে গেলেই এসব মামলা আর থাকবে না। আমরা জয়েন্ট স্টকে কাগজপত্র জমা দিতে পারলেই ওয়ারিশ ছয়জনই হাসান ইমামের শেয়ারের অংশীদার হবেন। অর্থাৎ তারাও কোম্পানীর শেয়ার হোল্ডার হবেন’। সমস্ত সমস্যা মিটে যাওয়ার পর বলাকা হলটি স্টার সিনেপ্লেক্সের অধীনে দিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে রয়েছে বলাকা সিনেমা হলের। মোহাম্মদ হোসেনের মেয়ের নামে প্রতিষ্ঠিত সনি সিনেমা হলটিও স্টার সিনেপ্লেক্সের অধীনে দেওয়া হয়েছে।, 


এ ব্যাপারে মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘বলাকা এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত। প্রচুর দর্শক রয়েছে ঐতিহ্যবাহী এ সিনেমা হলটির। আমাদের পরিকল্পনা তিনটি স্ক্রিন চালু করার। এরইমধ্যে আমরা স্টার সিনেপ্লেক্সের সঙ্গে প্রাথমিক কথাবার্তা বলে রেখেছি। আশা করছি আগামী এক-দুই মাসের মধ্যে সব নিষ্পত্তি করে সিনেপ্লেক্স নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারব।, 


 The post appeared first on Sarabangla http://dlvr.it/SXN1ZL

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন