শিরোনাম :

10/trending/recent

Hot Widget

অনুসন্ধান ফলাফল পেতে এখানে টাইপ করুন !

রোগীর ‘পকেট কেটে’ও সরকারের কাছে সাড়ে ৪ কোটি দাবি আনোয়ার খানের

ঢাকা: ২০২০ সালের মার্চ। মাত্রই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়েছে দেশে। পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে করোনায় আক্রান্তদের সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল সরকারকে। ওই সময় কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে সরকার। সরকারি খরচেই এসব বেসরকারি হাসপাতালে কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হবে বলে জানানো হয় স্মারকে। ২০২০ সালের ১৪ মে এ সংক্রান্ত স্মারকে সেই করার পর ১৭ মে থেকে সেবা দিতে শুরু করে রাজধানীর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। সরকার তো বটেই, হাসপাতালের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছিল এই হাসপাতালে সেবা নেওয়া করোনা রোগীদের খরচ বহন করবে সরকার।

মৌখিক এমন ঘোষণার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়নি বাস্তবে। যেসব কোভিড রোগী আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, তাদের একেকজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকার বিল নেওয়ার অভিযোগ ওঠে ওই সময়। বিল না পেয়ে রোগী আটকে রাখার অভিযোগও উঠেছে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে। এসব নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ পেলে কোনো কোনো রোগীকে বিলের টাকা ফেরত দিয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, তবে সেটিও পুরো টাকা নয়। বিল নেওয়ার পরও কোভিড রোগীদের চিকিৎসাবাবদ সরকারের কাছে চার কোটি ৫১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৪ টাকা বিল দাবি করেছে হাসপাতালটি!

এদিকে, একই রকমের হাতের লেখায় চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের হাজিরা খাতা, রোগীদের পর্যাপ্ত বিলের কাগজ দেখাতে না পারলেও সরকারের পক্ষ থেকে এই বিল দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে। আর কত জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে— এমন কোনো তথ্য জানা না থাকলেও এই বিলের কাগজের গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে সর্বোচ্চভাবে।

২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হলে চিকিৎসাসেবা নিয়ে সরকারি হাসপাতালগুলোর অপ্রস্তুতি সমালোচনার জন্ম দেয়। ওই সময়ই কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই করে সরকার। আনোয়ার খান মর্ডান ছাড়াও এই চুক্তির আওতায় ছিল রাজধানীর হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চট্টগ্রামের হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল, ইউএসটিসি’র বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল হাসপাতাল, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতাল, কুমিল্লার এএফসি হেলথ ফরটিস হার্ট ইনস্টিটিউট। সরকারিভাবে ও স্থানীয় প্রশাসনের সাহায্যে এই সব হাসপাতালে নাগরিকদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

এই হাসপাতালগুলো কত জন রোগীকে সেবা দিয়েছে, তার কোনো তথ্যই নেই স্বাস্থ্য অধিদফতর ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। ফলাফল হিসেবে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দাবি করা হয়েছে অস্বাভাবিক রকমের বিল; যেখানে নানা রকমের অসঙ্গতি থাকলেও তা নিয়ে কোনো ভূমিকা নিতে দেখা যায়নি। উল্টো অভিযোগ, বিল দেওয়ার প্রক্রিয়াতেই বেশি ব্যস্ত মন্ত্রণালয়।

রোগীদের পকেট কেটেছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল

২০২০ সালের ১৬ মে রাজধানীতে কোভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে ২০০ বেডের আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। ওই দিন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ড. আনোয়ার হোসেন খান বলেন, ‘আমরা প্রাথমিক অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সৌজন্যে কোনো খরচ নেব না। এটি মন্ত্রণালয় ও আমরা যৌথ উদ্যোগে করেছি। সুতরাং প্রাথমিকভাবে খরচের ব্যাপারে আমরা চিন্তা করছি না।’

২০২০ সালের ১৭ মে থেকে করোনা রোগীদের চিকিৎসাসেবা শুরু হয় আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে। সরকারি ব্যবস্থাপনায় বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে ভেবে এখানে ২০ মে ভর্তি হন রাজধানীর ফকিরারপুলের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. হুমায়ূন কবির। ২ জুন হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় তাকে দুই লাখ ৬৮ হাজার টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। তার আগেও তিনি ৭৫ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করেছিলেন।

বিলের বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে হুমায়ূন কবিরের টাকা ফেরত দেওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় ২০ হাজার ৭০০ টাকা। ওই সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারের সঙ্গে চুক্তি ৩১ মে শেষ হয়েছে। তাই শেষ দুই দিনের বিলের টাকা নেওয়া হয়েছে।

প্রায় একই ঘটনার শিকার হন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাইফুর রহমান। কোভিড-১৯ সংক্রমিত হওয়ার পর তিনি আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি হন ২০২০ সালের ২৩ মে। ৩১ মে তিনি কোভিড-১৯ সংক্রমণমুক্ত হলেও হাসপাতাল থেকে তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় ২ জুন। ওই সময় তাকে এক লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ টাকার বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। নিরুপায় হয়ে ওই বিলের টাকা পরিশোধ করে ছাড়পত্র নিতে হয় সাইফুর রহমানকে।

সারাবাংলা ডটনেটসহ একাধিক গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পর ওই বছরের ৩ জুন ফকিরাপুলের হুমায়ূন কবিরের মতো সাইফুর রহমানের টাকাও ফেরত দেওয়া হয়। তবে তার কাছ থেকেও ১ ও ২ জুনের টাকা রেখে এক লাখ ১৫ হাজার টাকা ফেরত দেওয়া হয়।

এতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না শিরিন ইসলাম নামে আরেক ভুক্তভোগী ও তার পরিবার। সমঝোতা চুক্তি থাকাকালীন চিকিৎসা নিলেও সাইফুর রহমান ও হুমায়ূন কবিরের মতো কোনো টাকা ফেরত পায়নি শিরিনের পরিবার। তাদের অভিযোগ, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন শিরিনের শ্বশুর। কয়েকদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর করোনা পরীক্ষার জন্য ২৭ মে তার নমুনা নেওয়া হয়। জানানো হয়, তিন দিন পর ফল জানানো হবে। ৩০ মে শিরিনের শ্বশুরের অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৮ শতাংশ থাকলেও তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। ৩১ মে জানানো হয়, তাকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে। কিন্তু ওই সময় গিয়ে শিরিনের পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন, ২৮ মে করোনা পরীক্ষায় নেগেটিভ এলেও সেটি জানানো হয়নি। পরীক্ষায় নেগেটিভ আসার পরও ক্লেক্সেন ইঞ্জেকশনসহ বেশকিছু ওষুধ দেওয়া হয়।

শিরিন জানান, রিলিজের সময় তাদের এক লাখ ৫৮ হাজার ৬৭২ টাকার বিল দেওয়া হয়, যা পুরোটাই ক্যাশে পেমেন্ট করতে বলা হয়। সেই বিলে ফ্যাভিপিরাভির ও ক্লেক্সেন ইঞ্জেকশনের দামও ধরা ছিল, যেগুলো সরকারিভাবে বিনামূল্যে সরবরাহ করার কথা ছিল।

হুমায়ূন, সাইফুর ও শিরিনের মতো এমন অনেকেই করোনা আক্রান্ত হয়ে আনোয়ার খান মডার্নে চিকিৎসা নিয়ে গুনেছেন বড় অঙ্কের বিল। হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের প্রেসক্রিপশন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চিকিৎসায় অনুমতি না থাকলেও তখন ব্যবহার করা হয়েছে ফ্যাভিরাপিরাভির।

রোগীর তথ্য নেই অধিদফতরে

এদিকে, করোনা সংক্রমিত হয়ে ঠিক কত জন আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদফতরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সেন্টারের (এমআইএস) কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. আমিনুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। তার অফিসে তিন দিন গেলেও তিনি ছিলেন অনুপস্থিত। তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কামরুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘স্যার মিটিংয়ে ব্যস্ত, তিনি বাইরে আছেন।’

মোট কতজন রোগীকে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে— এ তথ্য চাইলে এমআইএস’র তৎকালীন পরিচালক ডা. হাবিবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী পাঠানোর কথা থাকলেও আমরা চিকিৎসাধীনদের সম্পূর্ণ তথ্য পাই না। হাসপাতালগুলো এন্ট্রি না দিলে সেই তথ্য পাওয়া সম্ভব হয় না।’

হাসপাতালকে এ তথ্য কোথায় এন্ট্রি দিতে হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. হাবিবুর বলেন, ‘আমাদের এমআইএস বিভাগের একটি সফটওয়্যার আছে। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এখানে প্রতিদিন এন্ট্রি দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া আছে।’ জানা গেছে, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল ওই সফটওয়্যারে প্রকৃত তথ্য কখনোই দেয়নি।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) মো. হাবিবুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘সরকার যেসব হাসপাতালের নাম ঘোষণা করেছে, সেসব স্থানে চিকিৎসার বিনিময়ে টাকা নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। নেওয়া হয়ে থাকলে সেটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এমন অভিযোগ পাচ্ছি। আসলে দেশের এমন দুর্যোগে বেসরকারি হাসপাতালগুলো থেকে আমরা সহযোগিতা আশা করেছিলাম। কিন্তু তারা আমাদের সহযোগিতার নামে জিম্মি করে যাচ্ছে।’

সমঝোতা স্মারকের শর্ত উপেক্ষা করে রোগীদের কাছ থেকে বিল নেওয়ার জন্য আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না বা অন্তত এ অভিযোগ তদন্ত করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (হাসপাতাল অনুবিভাগ) বলতে পারবেন।’

তবে এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সেই অতিরিক্ত সচিব সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাচ্ছি না।’ এমনকি এসব বিষয়ে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

১২১ জনের চিকিৎসার বিল সাড়ে কোটি টাকার বেশি!

আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পক্ষ থেকে ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর একটি বিল জমা দেওয়া হয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ডা. মো. এনায়েত হোসেন শেখের সই করা ওই বিলে ১৮ দিনের চিকিৎসা বাবদ সরকারের কাছে তিন কোটি ৫৯ লাখ ২৮ হাজার ৫৭৫ টাকা দাবি করা হয়েছে। তাতে ১২১ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে মাত্র পাঁচ জনের কোভিড-১৯ সংক্রমণে শনাক্ত হওয়ার তথ্য সংযুক্ত করা হয়েছে বিলের সংযুক্তি হিসেবে।

ওই বিলের কপি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে— বিলে ১২১ জন রোগীর চিকিৎসার ব্যয় হিসেবে বিল করা হয়েছে ২৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৩৪ টাকা, বাকি ৩ কোটি ৩০ লাখ ৭১ হাজার ২৪১ টাকা বিল করা হয়েছে হাসপাতালের পরিচালক থেকে শুরু করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন এবং বিদ্যুৎ ও অন্যান্য বিল হিসেবে।

বিলের কপি থেকে আরও দেখা যায়, হাসপাতালটি ১৮ মে থেকে ২৭ মে পর্যন্ত ১০ দিনের বিল দাখিল করেছে একটি হিসাবে। অন্যদিকে ২৮ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত চার দিনের বিল দাখিল করেছে আরেকটি হিসাবে। তবে বিদ্যুৎ, পানিসহ ইউটিলিটি বিল বাবদ সমপরিমাণ টাকা দাবি করা হয়েছে দুইটি গ্রুপেই। অথচ এই বিলটি একবারই প্রাপ্য হওয়ার কথা। অন্যদিকে হাসপাতালের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিলও একমাসের হিসাবে একবার পাওয়ার কথা থাকলেও সেই বিল দাবি করা হয়েছে দুইটি গ্রুপে। এছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যে বিল দাখিল করার কথা, তার চেয়ে বেশি বিল দাবি করেছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুইবার করে হিসাব করা টাকার অঙ্গ বাদ দিলেও এই হাসপাতালের দাবি করা বিলের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন কোটি ৫৯ লাখ ২৮ হাজার ৫৭৫ টাকা।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সারাবাংলাকে জানান, আবেদনপত্রে সংযুক্তি হিসেবে যে বিলের কপি দেওয়া আছে তা যোগ করে দেখা যায়, রোগীদের জন্য প্রকৃত বিল হবে ১২ লাখ ৬০০ টাকা। এছাড়া ১২১ জন রোগীর চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের সঙ্গে মিল নেই মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা বিলের। রোগীর ভর্তি থেকে শুরু করে তাদের মোট চিকিৎসা বিল ও হাসপাতাল থেকে দেওয়া ছাড়পত্রেরও কোনো কপি সংযুক্ত নেই বিলে। এমনকি মৃতদের ক্ষেত্রে মৃত্যুসনদও সংযুক্ত করা হয়নি বিলের সঙ্গে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট অনুবিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, বিলের কপিতে খাদ্য ও অন্যান্য বিল বাবদ কিছু কাগজ সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু সবগুলো কাগজেই একই ব্যক্তির হাতে লেখা। কিন্তু এই বিলের কপি সর্বোচ্চ গোপনীয়তা রক্ষা করা হচ্ছে নানা কারণে।

এই কর্মকর্তা বলেন, ‘আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পক্ষ থেকে দাবি করা বিলের কপি থেকে দেখা যায়, ১২১ জন রোগীর প্রত্যেকের জন্য আলাদা লিনেনস বিল দেওয়া হয়েছে। দুই ধাপে বিল চাওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা বাবদ দেওয়া যেতে পারে ৪০ হাজার ১৫০ টাকা দেওয়া। সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিল দেওয়া হলেও সেটি কখনোই এত বেশি হবে না।’

এই কর্মকর্তা জানান, সংযুক্তিতে চিকিৎসকদের হাজিরার বিষয়ে যে কাগজ দেখানো হয়েছে সেগুলো একজন ব্যক্তিরই হাতের লেখা। বিলের কপি স্বাস্থ্য অধিদফতরের একজন উপপরিচালক, পরিচালক, মহাপরিচালক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হাতেগোনা কয়েকজন কর্মকর্তাকে দেখানো হয়েছে। তাই এ বিষয়ে সবাই চাইলেও মন্তব্য করতে পারবেন না।

সমঝোতা স্মারক চুক্তি, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের দাখিল করা বিল এবং স্বাস্থ্য বিভাগের পর্যালোচনা সংক্রান্ত কিছু নথি সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। সেসব নথি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের দাবি করা বিলের সঙ্গে সমঝোতা চুক্তির বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকেই আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন দেওয়ার কথা। এক্ষেত্রে রোগীদের কাছ থেকে এই বাবদ বিল নেওয়ার কথা না হাসপাতালটির। তবে একাধিক রোগীর বিলের কপিতে দেখা গেছে, চিকিৎসকদের বিল বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়েছে তাদের কাছ থেকে। হাসপাতালের বিলও নেওয়া হয়েছে অনেক বেশি।

আনোয়ার খান মডার্ন কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া বিলে চিকিৎসকদের এক মাসের বেতন দাবি করেছে। হাসপাতালটি জানিয়েছে, এই এক মাসের মধ্যে ১০ দিন দায়িত্ব পালন করার পর চিকিৎসকরা ১৪ দিনের কোয়ারেনটাইনে ছিলেন। আর ছয় দিন ছুটি কাটিয়েছেন। সব মিলিয়ে তাদের ৩০ দিন হিসাব করা হয়েছে। তবে এ দাবিকে অযৌক্তিক অভিহিত করে হাসপাতালটির আইসিইউ ও জেনারেল বেড বিভাগের একাধিক চিকিৎসক ও নার্স সারাবাংলাকে বলেন, ওই সময় সারাদেশে চিকিৎসক, নার্সসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয় সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে। ফলে এই ছয় দিনের ছুটি কেউ পাননি। তারা আরও দাবি করেন, যে হিসাবে সরকারের কাছে বিল চেয়েছে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতাল, চিকিৎসকদের সেই হিসাবে বেতন-ভাতা কিছুই দেওয়া হয়নি।

বিল নিয়ে যা বলছে স্বাস্থ্য অধিদফতর মন্ত্রণালয়

২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পক্ষ থেকে বিল পাঠানো হয় স্বাস্থ্য অধিদফতরে। কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে এই বিল পরিশোধ নিয়ে একাধিক বক্তব্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পক্ষ থেকে সবশেষ গত ১ ফেব্রুয়ারি একটি সংশোধনী পাঠানো হয়েছে বলে জানান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা। তবে এখন পর্যন্ত বিলের কোনো অগ্রগতি নেই বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল) ডা. ফরিদ মিঞা সারাবাংলাকে বলেন, ‘আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের সঙ্গে যখন সরকারের সমঝোতা চুক্তি হয়, তখন আমি এখানে ছিলাম না। তবে তাদের কাছ থেকে একটি বিল জমা দেওয়া হয়েছে। আমরা সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী বিবেচনা করে আমাদের মতামত জানিয়েছি। এখন এটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিবেচনাধীন বিষয়।’

এদিকে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব লোকমান হোসেন মিঞার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অডিট অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সঠিক তথ্য দিতে পারবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বাজেট-১ ও ২ অধিশাখা বিভাগের ড. মো. এনামুল হক।’

জানতে চাইলে ড. মো. এনামুল হক সারাবাংলাকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমার জানামতে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের কোনো বিল আমরা দিইনি। ‘এটি স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিষয়। ‘সেখান থেকে হাসপাতাল বিভাগের পরিচালক ও মহাপরিচালক সবকিছু যাচাই-বাছাই করে আমাদের কাছে পাঠালে আমরা সেটি বিবেচনা করব।’

যা বলছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ

জানতে চাইলে আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. এহতেশামুল সারাবাংলাকে বলেন, ‘বিলের বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই। বর্তমানে আমি অন্য জায়গায় কর্মরত আছি। ‘তবে আমি যতদিন ছিলাম, এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না।’

বিল দাখিলের কাগজে সই করা আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এনায়েত শেখের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে জানা যায়, তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।

আনোয়ার খান মডার্ন হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও সংসদ সদস্য আনোয়ার খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। ‘মোবাইলে কল ও এসএমএস দিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।,

from Sarabangla | https://ift.tt/W5Uyd48 via IFTTT

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.

Top Post Ad

Below Post Ad