পূজোর ফ্রি হাট: আনন্দে ভরলো পূর্বধলার বঞ্চিত মানুষের মুখ
শফিকুল আলম শাহীন, পূর্বধলা (নেত্রকোনা) : শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে যখন শহর-গ্রাম জুড়ে উৎসবের আমেজ, তখনও সমাজের এক শ্রেণির মানুষের মনে থাকে চাপা দুঃখ। নতুন পোশাক, প্রসাধনী কিংবা পূজার সামগ্রী কেনার সামর্থ্য থাকে না অনেকেরই। তবে নেত্রকোনার পূর্বধলার বৈরাটি ইউনিয়নের কাজলা গ্রামে এবার সেই বঞ্চনার চিত্র কিছুটা হলেও বদলে দিয়েছে এক অনন্য আয়োজন—“পূজোর ফ্রি হাট”।
শনিবার (২৭ সেপ্টেম্বর) শাহেদা স্মৃতি পাঠাগার প্রাঙ্গণে ভিন্নধর্মী এই আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশন। সকালের পর থেকেই এলাকার সুবিধাবঞ্চিত নারী-পুরুষ ও শিশুদের ভিড়ে জমে ওঠে পাঠাগার চত্বর। কারও মুখে উচ্ছ্বাস, কারও চোখে আনন্দাশ্রু—যেন পূজার আগেই ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে।বেলা সাড়ে এগারটায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কোঅর্ডিনেটর (গ্রেড-১) আনসার উদ্দিন খান পাঠান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে হাটের উদ্বোধন করেন। উদ্বোধনের পরপরই সারি সারি টেবিলে সাজানো হয় নতুন পোশাক, শাড়ি, লুঙ্গি, শিশুদের জামা, প্রসাধনী, খাদ্যসামগ্রীসহ পূজার প্রয়োজনীয় নানা সামগ্রী। সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা এখানে এসে নিজেদের পছন্দের জিনিস বেছে নেন—অর্থ খরচ ছাড়াই।
মুক্তির বন্ধন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মো. ইকবাল হোসেন জানান, “আমাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজের অসচ্ছল মানুষদের মুখে আনন্দ ফোটানো। বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের অসহায় মানুষরা যেন পূজার সময় বঞ্চিত না হয়, সেজন্য এই হাটের আয়োজন। তবে এর মধ্য দিয়ে আমরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তাও ছড়িয়ে দিতে চাই।”
শুধু চেয়ারম্যানই নন, সংগঠনের অন্যান্য নেতৃবৃন্দরাও জানান, এ ধরনের উদ্যোগ তাদের স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. রেজাউল করিম লিটন, নির্বাহী পরিচালক মো. শহীদুল ইসলাম, কর্মসূচি সমন্বয়ক মো. হাবিবুল বাসার সুমন, মো. শাহরীয়ার খান ইমন প্রমুখ।
স্থানীয় এক গৃহবধূ বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি যে কোনোদিন বিনা পয়সায় নতুন শাড়ি পাবো। পূজার আগে এর চেয়ে বড় আনন্দ আমাদের জন্য আর কিছু নেই।” আবার এক বৃদ্ধ পূজারি জানালেন, “এমন উদ্যোগ শুধু আমাদের উৎসবকে আনন্দময় করেছে না, বরং সমাজে ভালোবাসা আর মিলনের বার্তা ছড়িয়েছে।”
“পূজোর ফ্রি হাট” শুধু একটি সাময়িক আয়োজন নয়—এটি এক ধরনের সামাজিক বার্তা। সামর্থ্যবানরা যেখানে খুশি-আনন্দে উৎসব পালন করেন, সেখানে পিছিয়ে পড়াদেরও সমানভাবে উৎসবে শামিল করার চেষ্টা করছে এ আয়োজন। অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মানবিকতা ও সম্প্রীতির এ বার্তা এখন সমাজে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
এ যেন কেবল একটি হাট নয়, বরং এক অভিন্নতার সেতুবন্ধন—যেখানে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি হয়ে যায় সবার মাঝে।

