শিরোনাম:
শিরোনাম লোড হচ্ছে...
শিরোনাম:
লোড হচ্ছে...

উন্নয়ন শুধু অট্টালিকা নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নই প্রকৃত উন্নয়ন: কায়সার কামাল

একটি এলাকার উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম
প্রকাশঃ
০ জন এই প্রতিবেদনটি পড়েছেন
দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: একটি এলাকার উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষার মানোন্নয়ন ও মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ গড়ে তোলাই প্রকৃত উন্নয়নের অন্যতম মাপকাঠি বলে মন্তব্য করেছেন নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের নবনিযুক্ত ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তিনি বলেন, গতানুগতিক রাজনৈতিক কর্মী বা এমপি হিসেবে নয়, এলাকার শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে চান।
রোববার (২৩ আগস্ট) দুপুরে নেত্রকোনার দুর্গাপুরে কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি (বিরিশিরি) মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে এবতেদায়ি পঞ্চম শ্রেণি, অষ্টম শ্রেণি/সমমান জুনিয়র বৃত্তিপ্রাপ্ত এবং এসএসসি/সমমান-২০২৬ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মুন মুন জাহান লিজা।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, “আমাকে আপনারা দয়া করে গতানুগতিক ধারার কোনো রাজনৈতিক কর্মী বা এমপি হিসেবে দেখবেন না। আমি শুধু ইট-পাথরের অট্টালিকা বা দালানকোঠা নির্মাণ করে উন্নয়নের প্রমাণ দিতে চাই না। আমি চাই আমাদের এ অঞ্চলের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা ও মানবিক উন্নয়ন।”

নারী শিক্ষার্থীদের সাফল্যের প্রশংসা করে তিনি বলেন, সাধারণ শাখায় ২৮ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর মধ্যে ২১ জনই নারী। এ সাফল্যকে তিনি দুর্গাপুরের জন্য আশাব্যঞ্জক বলে উল্লেখ করেন।

ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমি স্বপ্ন দেখি, আজকের বিশেষ অতিথি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের বক্তব্য শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে আগামী দিনে দুর্গাপুর-কলমাকান্দা থেকেই কেউ একজন এমন পদে আসীন হবে।”

গত ২১ আগস্ট জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার হিসেবে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন কায়সার কামাল। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেওয়ার সময় আমি কল্পনা করছিলাম এবং প্রত্যাশা করছিলাম, আগামী দিনে কলমাকান্দা-দুর্গাপুরের কোনো সন্তান যেন রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হয়ে শপথ বাক্য পাঠ করে। অভিভাবক হিসেবে আমি সেই স্বপ্নের জায়গাটা বাড়িয়ে দিয়েছি।”

এ সময় এলাকার কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক ফলাফল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন তিনি। তিনি বলেন, “উন্নয়ন বলতে আমি শুধু অট্টালিকা বুঝি না। আমি কাগজ উল্টে দেখছিলাম, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের এলাকার তিনটি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাসের হার ৪০ শতাংশের নিচে। এমপিওভুক্ত স্কুলগুলো সরকারি স্কুলের মতোই সুযোগ-সুবিধা পায়, তাহলে তাদের ফলাফল কেন এত খারাপ হবে?”

গুজিরকোনা হাইস্কুল ও বালিকা বিদ্যালয়ের ফলাফল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গুজিরকোনার মতো এলাকায় ছেলেদের স্কুল থেকে মাত্র একজন জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং মেয়েদের স্কুল থেকে কেউ জিপিএ-৫ পায়নি। এ অবস্থায় শুধু নতুন ভবন নির্মাণ না করে শিক্ষার মানোন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

তিনি বলেন, “আপনারা আমার কাছে তিনতলা-চারতলা বিল্ডিং চান। আমি হয়তো চারতলা ভবন দিতাম, এখন আমাকে পুনরায় ভাবতে হচ্ছে। কারণ অট্টালিকা দিয়ে কী হবে, যদি সেখান থেকে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল বা ভালো শিক্ষার্থীই বের করতে না পারি!”

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত এবং সমাধানের উদ্যোগ নিতে ইউএনও ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। দুর্গাপুরের পাইলট স্কুল ও পিসিনল স্কুলের কারিগরি শাখার ফলাফল আশানুরূপ না হওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা গড়ে তোলারও আহ্বান জানান ডেপুটি স্পিকার।

শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “শিক্ষক সবার জন্যই শিক্ষক। দয়া করে বাচ্চাদের একটু ভালোভাবে পড়ানোর চেষ্টা করুন। শুধু পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি তাদের মানবিক গুণাবলিতে গুণান্বিত করুন।”

জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার উদাহরণ দিয়ে কায়সার কামাল বলেন, “জাপানে পঞ্চম বা ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের কোনো প্রতিযোগিতামূলক একাডেমিক পরীক্ষা নেওয়া হয় না। সেখানে আগে বাচ্চাদের মানবিক গুণাবলিতে গড়ে তোলা হয়। আমাদেরও সেই পথে হাঁটতে হবে।”

কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কারিগরি শিক্ষায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ আমরা বিএ, এমএ পাস করে বেকার থাকি, টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজ থেকে পাস করে কেউ বেকার থাকে না।”

বক্তব্যের শুরুতে মানবতা ও সততার ওপর গুরুত্বারোপ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমরা যে যত বড়ই হই না কেন, প্রত্যেকেই কিন্তু মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা যদি আমাদের কর্মের মাধ্যমে নিজেদের কাছে আত্মতৃপ্তি না পাই, তাহলে মানুষ হওয়ার কোনো সার্থকতা নেই। সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করলেই কেবল এই আত্মতৃপ্তি লাভ করা সম্ভব।”

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে কৃতি শিক্ষার্থীদের হাতে সার্টিফিকেট ও সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়। এ সময় ডেপুটি স্পিকার তাঁর ব্যক্তিগত পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের বিশ্বখ্যাত রুশ সাহিত্যিক লিও টলস্টয়ের ‘How Much Land Does a Man Need?’ বইটি উপহার দেন।

অষ্টম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “বইটির সব অর্থ হয়তো একবারে বোঝা সম্ভব নয়। ডিকশনারি পাশে নিয়ে বইটি পড়বে। তোমাদের ভবিষ্যৎ জীবন গড়ার ক্ষেত্রে এই বইটি অনেক কাজে লাগবে।”

দুপুর গড়িয়ে যাওয়ায় উপস্থিত সবার ক্ষুধার কথা বিবেচনা করে বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করেন ডেপুটি স্পিকার। অনুষ্ঠানে দেরিতে যোগ দেওয়ার জন্য তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক, কৃতি শিক্ষার্থী এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

এই খবরের অডিও ভার্সন শুনতে নিচের প্লে বাটনে ক্লিক করুন

0:00 / 0:00 0%

একটি মন্তব্য করুন