জ্বালানি নিরাপত্তায় বেসরকারি খাত: চাই স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা ও জনস্বার্থ
দেশের নিরবচ্ছিন্ন ও টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী।বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিংবা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় আকস্মিক বিঘ্নের মতো পরিস্থিতিতে সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বেসরকারি খাতের পুঁজি, অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতাকে কাজে লাগানো যৌক্তিক। তবে জ্বালানির মতো কৌশলগত ও স্পর্শকাতর খাতে যেকোনো নতুন নীতিমালার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত জনস্বার্থ, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা, জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা।
প্রস্তাবিত নীতিমালাকে ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের আলোচনা ও আশঙ্কা প্রকাশ পেয়েছে। এ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে তাদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত নীতিমালায় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীকে বিশেষ সুবিধা কিংবা একচেটিয়া প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে প্রচারিত কিছু তথ্য অনুমাননির্ভর ও অসত্য বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি সংস্থার এই ব্যাখ্যা বিভ্রান্তি নিরসনে সহায়ক হতে পারে। একই সঙ্গে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা হলে এ ধরনের সংশয় তৈরির সুযোগ আরও কমবে।
জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
প্রথমত, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার অর্থ যেন কোনোভাবেই বাজারে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বা অতিরিক্ত বাজার-সংকেন্দ্রণ তৈরি না করে। লাইসেন্স প্রদান, আমদানি অনুমোদন, কোটা বণ্টন ও মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ, উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এতে যোগ্য উদ্যোক্তারা ন্যায্য প্রতিযোগিতার সুযোগ পাবেন।
দ্বিতীয়ত, অংশীজনদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, অর্থনীতিবিদ, ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য অংশীজনের মতামত নেওয়া যেতে পারে। খসড়া নীতিমালা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে মতামত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা করা হলে নীতিমালা নিয়ে বিভ্রান্তি ও সংশয় অনেকটাই দূর হতে পারে।
তৃতীয়ত, জ্বালানির মান ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। বেসরকারি পর্যায়ে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিপণনের ক্ষেত্রে মান নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা জরুরি। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি থাকলে ভোক্তার স্বার্থ যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি বাজারে জ্বালানির মান নিয়েও আস্থা বাড়বে।
জ্বালানি একটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্প, কৃষি, পরিবহন থেকে শুরু করে মানুষের দৈনন্দিন জীবন—সব ক্ষেত্রেই এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। ফলে জ্বালানি খাতকে ঘিরে যাচাই-বাছাইহীন তথ্য বা গুজব যেমন বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি নীতিমালায় অস্পষ্টতা বা দুর্বল তদারকিও দীর্ঘমেয়াদে জনস্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তাই বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় তদারকি, জবাবদিহি ও জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নীতিমালা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ সফল হবে তখনই, যখন সেখানে সবার জন্য সমান সুযোগ, স্বচ্ছ নীতিমালা, কার্যকর তদারকি এবং জনস্বার্থের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নিশ্চিত থাকবে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে ‘জ্বালানি নীতিমালা, ২০২৬’ এমন একটি কাঠামো তৈরি করবে—এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: রোটারিয়ান এম. নাজমুল হাসান, বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রচিন্তক।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন